Monday, June 10, 2013

বহুধাবিভক্ত ইসলামী দল

দেশে ধর্মভিত্তিক বা ইসলামী দলের সংখ্যার যেন কোনো শেষ নেই। এসব দলের সঠিক পরিসংখ্যান কত তা নিশ্চিতভাবে জানেন না কেউ। ইস্যুভিত্তিক ইসলামী জোট ও মোর্চার সংখ্যা আরও ব্যাপক।
একটি দলের একাধিক নেতা যেমন পৃথক দল গঠন করেছেন, তেমনি এক নেতাই একাধিক দলেরও দায়িত্বে রয়েছেন। বিভক্তির কারণে প্রায় একই নামে আছে বেশ কয়েকটি দল। আদর্শগত কারণের চেয়ে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণেই বেশিরভাগ দলের বিভক্তি এবং নতুন নতুন দল গঠন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিমত। এসব কারণে বিভিন্ন মহল থেকে বেশ কয়েকবার ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। বরং দলের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তবে সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে অরাজনৈতিক প্লাটফর্ম হলেও অধিকাংশ ইসলামী দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করলেও অসংখ্য ইসলামী দল গড়ে ওঠা প্রসঙ্গে প্রবীন রাজনীতিক ও খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, নেতা হওয়ার নেশা, নিয়মনীতি নিয়ে মতভেদসহ নানা সমস্যার কারণে বহু দল সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে ঐকমত্য হলেও ইসলামী দল বেশি হওয়ায় মূল কাজে ক্ষতি হয় ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্যই ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু সেটাও ভেঙে কয়েকটা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, দেশে দল ভাঙার রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব থেকে ইসলামী দলগুলোও মুক্ত নয়। ইসলামী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে অল্প সময়ে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে জামায়াত ছাড়া প্রায় সব ইসলামী দলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন একটি বড় অর্জন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সক্রিয় ইসলামী দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী এ তালিকা অনেক দীর্ঘ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনপ্রাপ্ত ইসলামী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ১১টি। এর বাইরেও রয়েছে বহু দল। এ বছর নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেও নিবন্ধন-অযোগ্য হয়েছে ৫/৬টি দল। এর বাইরেও কাজ করে যাচ্ছে বেশ কিছু ইসলামী দল ও সংগঠন।

নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে বড় ও পুরনো দল হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ১৯৪১ সালে মওদুদী প্রতিষ্ঠিত দলটি এদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭২ সালে অন্য সব ইসলামী দলের সঙ্গে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পরের বছর জামায়াত ও নেজামে ইসলাম পার্টিসহ নিষিদ্ধ কয়েকটি দল নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আইডিয়াল নামের নতুন দল। এর অন্যতম দায়িত্বে ছিলেন জামায়াত নেতা মাওলানা আবদুর রহীম। ’৭৯ সালে আইডিয়াল থেকে বেরিয়ে গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াত পুনর্গঠিত হয়। যার কার্যক্রম এখনো অব্যাহত আছে। আর ’৮৪ সালের ৩০ নভেম্বর আইডিয়াল ভেঙে দিয়ে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন নামে নতুন দল করেন মাওলানা আবদুর রহীম। কিন্তু গঠনতন্ত্র সংশোধন নিয়ে নেতাদের মতানৈক্যের কারণে ২০০১ সালে এ দলের মহাসচিব আজিজুল হক মুরাদের নেতৃত্বে একই নামে আরেকটি দল গঠিত হয়। দুটি দলই বর্তমানে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

আলোচিত আরেকটি দলের নাম খেলাফত আন্দোলন। ১৯৮১ সালের ২৯ নভেম্বর মরহুম হাফেজ্জি হুজুর এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ দলে মরহুম শায়খুল হাদীস মাওলানা আজিজুল হক, মুফতি ফজলুল হক আমিনী ও চরমোনাই পীর মুফতি ফজলুল করিমসহ অনেক আলেম থাকলেও পরে তারা পৃথক দল করেন। বিভিন্ন মতানৈক্যের কারণে ’৮৬ সালে আজিজুল হক ও চরমোনাই পীর বের হয়ে যান। ’৮৯ সালে বের হন মুফতি আমিনী। হাফেজ্জি হুজুরের বড় ছেলে মাওলানা শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফ বর্তমানে দলটির আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ইসলামী দলের বিভক্তি প্রসঙ্গে খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, সাংগঠনিক সুবিধার জন্য বহু দল গঠন ভালো। তবে ইসলামের স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি।

১৯৮৭ সালের ১৩ মার্চ একটি ইসলামী মোর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন বায়তুশ শরফ ও চরমোনাই পীর মাওলানা আবদুর রহীম, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মোস্তফা আল-মাদানী প্রমুখ। তবে ’৯০ সালের দিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে মোর্চাটি চরমোনাই পীর মুফতি ফজলুল করিমের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন দল থেকে বের হয়ে যান অন্য নেতারা। চরমোনাই পীর এর আগে খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টিতেও ছিলেন। ২০০৮ সালে নিবন্ধনের সময় দলটির নাম পরিবর্তন করে ইসলামী আন্দোলন করা হয়। চরমোনাইয়ের বর্তমান পীর মুফতি রেজাউল করিম এর আমিরের দায়িত্বে রয়েছেন। এদিকে চরমোনাইয়ের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মুজাহিদ কমিটি নামে আরেকটি অরাজনৈতিক সংগঠন আছে। চরমোনাই পীর এটির আমিরুল মুজাহিদীন পদে আছেন। ’৮৯ সালে শায়খুল হাদিস আজিজুল হক প্রতিষ্ঠা করেন খেলাফত মজলিস নামের নতুন দল। পরের বছর তারই নেতৃত্বে ফরায়েজি জামায়াত, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনের সমন্বয়ে গঠিত হয় ইসলামী ঐক্যজোট নামের মোর্চা। কিন্তু ২০০১ সালে ৪ দলীয় জোট সরকারের শুরুতেই এই জোট ভেঙে আজিজুল হক ও মুফতি আমিনীর নেতৃত্বে দু’ভাগ হয়ে যায়। ৬ মাস পর শায়খুল হাদীস আজিজুল হকের ইসলামী ঐক্যজোট আবার বিভক্ত হয়ে প্রথমে মুফতি ইজহারের নেতৃত্বে ও পরে মিছবাহুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আসে। যা এখনও বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট নামে কাজ চালাচ্ছে। তবে মুফতি আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোট নিবন্ধিত হয়ে আলাদা রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়। এর শরিক আবার ৪টি দল রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে খেলাফতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি, ফরায়েজি জামায়াত ও ওলামা কমিটি। ঐক্যজোটের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে আছেন মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী। একইসঙ্গে তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব পদেও আছেন। দলীয় সিদ্ধান্তেই এ দুটি পদের দায়িত্ব পালন করছেন বলে তিনি আলোকিত বাংলাদেশকে জানান। একইভাবে মুফতি আমিনীর মৃত্যুর পর ইসলামী ঐক্যজোটের নায়েবে আমির ও খেলাফতে ইসলামীর আমিরের দায়িত্বে আছেন তার ছেলে আবুল হাসনাত আমিনী। এদিকে নেতাদের মতানৈক্যের কারণে ২০০৫ সালের মে’তে শায়খুল হাদীস প্রতিষ্ঠিত খেলাফত মজলিস বিভক্ত হয়ে যায়। একই সময়ে তার নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটও বিলুপ্ত হয়। পরে প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও অধ্যক্ষ মাওলানা ইসহাকের নেতৃত্বে খেলাফত মজলিস নামে দুই অংশ পৃথক দল হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে কাজ চালাচ্ছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মুফতি শহীদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন নেতা বের হয়ে এসে গণসেবা আন্দোলন নামে পৃথক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। পুরনো দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ২০০৫ সালের ২০ আগস্ট বিভক্ত হয়ে যায়। শায়খ আবদুল মোবিনের নেতৃত্বে মূল দলটি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত। অপর অংশের নেতৃত্বে আছেন শোলাকিয়ার ঈদগাহের ইমাম মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসউদ। দলের কোনো তৎপরতা না থাকলেও তিনি নিবন্ধন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। ইসলামী সমমনা দল হিসেবে পরিচিত পুরনো দল বাংলাদেশ মুসলিম লীগও বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে বর্তমানে দুটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি একটিসহ দুটি দলই নিবন্ধন লাভ করেছে।

নিবন্ধিত ইসলামী দলের মধ্যে আরও রয়েছে নজিবুল বশর মাইজভা-ারীর নেতৃত্বাধীন তরিকত ফেডারেশন, আটরশির পীরের নেতৃত্বাধীন জাকের পার্টি, সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদীর ইসলামীক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (এমএ জলিল । এর বাইরে পরিচিত ইসলামী দল হচ্ছে বাংলাদেশ ইসলামীক পার্টি, মুসলিম লীগ, গণতান্ত্রিক ইসলামী ঐক্যজোট, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত প্রমুখ। রাজনৈতিক দলের বাইরে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বহু সংগঠন আছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ বায়তুশ শরফের পীরের ‘আঞ্জুমানে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ’, জৈনপুরের পীর মাওলানা সৈয়দ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর ‘জমিয়তুস শাবাব’, শর্ষীনার পীরের ‘জমিয়তে হিজবুল্লাহ’, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদের ‘ইসলাহুল মুসলিমীন’, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরীর (রহ.) ‘খাদেমুল ইসলাম জামায়াত বাংলাদেশ’, ফুরফুরার পীরের ‘নেদায়ে ইসলাম’, ফুলতলীর পীর প্রতিষ্ঠিত ‘আঞ্জুমানে আল ইসলাম’, ‘আহলে হাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’, ‘জমিয়াতে আহলে হাদীছ’, রাজারবাগের পীরের ‘আঞ্জুমানে আল বাইয়্যনাত’, দেওয়ানবাগী পীরের ‘আশেকে রাসুল (সা.)’ উল্লেখযোগ্য।

ইস্যুভিত্তিক গড়ে ওঠা মোর্চার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদ, মুফতি আমিনী প্রতিষ্ঠিত ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি, ইসলামী ও সমমনা ১২ দল, ইসলামী দলগুলো, ইমাম-ওলামা সমন্বয় ঐক্যপরিষদ, দাওয়াতে ইসলাম। ২০১০ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হেফাজতে ইসলাম সবচেয়ে আলোচিত অরাজনৈতিক সংগঠন। এসব সংগঠনের বেশিরভাগ নেতাই কোনো না কোনো ইসলামী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত বা সমর্থক। ফেৎনা বিষয়ক ও কাদিয়ানীবিরোধী সংগঠন হচ্ছে ‘ফেৎনা প্রতিরোধ কমিটি’, ‘বাংলাদেশ ফেৎনা প্রতিরোধ কমিটি’, ‘বাতিল প্রতিরোধ কমিটি’, ‘ইসলামবিরোধী তৎপরতা প্রতিরোধ কমিটি’, ‘অইৈসলামীক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’, ‘আন্তর্জাতিক মজলিসে মাহফিজে খতমে নবুওয়্যত’, ‘ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুওয়াত মুভমেন্ট’, ‘খতমে নবুওয়্যত কমিটি বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত’ ও ‘খতমে নবুওয়্যত আন্দোলন। এছাড়া সেবামূলক বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন দেশে কাজ চালাচ্ছে। এসব সংগঠনের বেশিরভাগ নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
Source

No comments:

Post a Comment